পোশাক খাত

পাঁচ মাসে নিটওয়্যারের নেতিবাচক রফতানি প্রবৃদ্ধি

নিটওয়্যার ও ওভেন—মোটাদাগে এ দুই ধরনের পোশাক বিশ্ববাজারে রফতানি করে বাংলাদেশ। এসব পোশাক রফতানিতে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্য সংযোজনের হার ছিল ৫৯ শতাংশ।

নিটওয়্যার ও ওভেন—মোটাদাগে এ দুই ধরনের পোশাক বিশ্ববাজারে রফতানি করে বাংলাদেশ। এসব পোশাক রফতানিতে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্য সংযোজনের হার ছিল ৫৯ শতাংশ। স্থানীয় উৎস থেকে পোশাকের কাঁচামাল উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনায় ওভেনের চেয়ে নিটওয়্যার পোশাক পণ্যের মূল্য সংযোজন সক্ষমতা বেশি। কিন্তু চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে নিটওয়্যার রফতানির প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক।

রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের সুতা ও কাপড় উৎপাদন এবং সরবরাহকারী শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) ভাষ্য অনুযায়ী, রফতানিমুখী নিটওয়্যার পোশাক প্রস্তুতে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের চাহিদার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের। অন্যদিকে ওভেন পোশাকের জন্য স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল জোগান সক্ষমতা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মতো। অর্থাৎ নিটওয়্যারে মূল্য সংযোজন সক্ষমতা ওভেন পোশাকের চেয়ে বেশি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নিটওয়্যার পণ্যের রফতানি প্রবৃদ্ধি কমেছে বা ঋণাত্মক ১ শতাংশ। ওভেন পোশাকের রফতানি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এ হিসাবেই পাঁচ মাসে নিটওয়্যার রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের তৈরি পোশাক রফতানির প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ট্রাউজার, টি-শার্ট অ্যান্ড নিটেড শার্ট, সুয়েটার, শার্ট অ্যান্ড ব্লাউজ ও আন্ডারওয়্যার। খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টি-শার্ট, পোলো শার্ট, আন্ডারওয়্যার, লেগিংস—এ পণ্যগুলো নিটওয়্যার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর শার্ট, ট্রাউজার বা প্যান্ট, জ্যাকেট, ব্লেজার—এ পণ্যগুলো ওভেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে টি-শার্ট, পোলো শার্ট, আন্ডারওয়্যার, লেগিংস বা নিটওয়্যার পণ্য রফতানির অর্থমূল্য ছিল ৮৮৫ কোটি ৬২ লাখ ডলার। একই সময়ে শার্ট, ট্রাউজার বা প্যান্ট, জ্যাকেট, ব্লেজার বা ওভেন পণ্যের রফতানির অর্থমূল্য ছিল ৭২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ রফতানি প্রবৃদ্ধিতে পিছিয়ে পড়লেও অর্থমূল্য বিবেচনায় ওভেনের চেয়ে নিটওয়্যারের অবস্থান শক্তিশালী।

নিটওয়্যার পোশাকের রফতানিকারকরা বলছেন, নিটওয়্যার পণ্য রফতানির বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হলো ব্যাংকের নানা অসহযোগিতা। অন্যান্য প্রধান কারণের মধ্যে রয়েছে নিটওয়্যার পণ্যের বৈচিত্র্য ঘাটতি। বর্তমানে বাজার খারাপ হওয়ার কারণে এবং মূল্য কমে যাওয়ার কারণে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ক্রয়াদেশ নেয়া যাচ্ছে না। ক্রয়াদেশ যেগুলো নেয়া হচ্ছে সেগুলোর মাধ্যমে দিন শেষে ১ পয়সা মুনাফার সুযোগও দেখা যায় না। বরং হিসাবে ক্ষতি আসে। ফলে অনেক সময় ক্রয়াদেশ ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ম্যান মেড ফাইবারের যে ধারা রয়েছে সেখানে অধিকাংশই নিটওয়্যার। ম্যান মেড ফাইবারভিত্তিক নিটওয়্যার পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আমরা যদি বৈচিত্র্য আনতে না পারি তাহলে যত দিন যাবে প্রবৃদ্ধি কমতেই থাকবে।’

বাংলাদেশ মূলত কটনভিত্তিক নিটওয়্যার পণ্য উৎপাদন করে, এ ধরনের পণ্যের চাহিদা ধীরে ধীরে কমে আসছে জানিয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘কটনভিত্তিক টি-শার্টসহ অন্যান্য নিটওয়্যার পণ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা শক্তিশালী। কিন্তু বৈশ্বিক পর্যায়ে ভোক্তারা কটনভিত্তিক নিটওয়্যারের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে। তারা ম্যান মেড ফাইবারভিত্তিক নিটওয়্যার পণ্য কেনার প্রতি বেশি আগ্রহী। বাংলাদেশকে তাই ম্যান মেড ফাইবারভিত্তিক নিটওয়্যার পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগে যেতে হবে। কিন্তু উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে যাচ্ছেন না, কারণ ২০১৯ সাল-পরবর্তী সময় থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিনিয়োগ পরিবেশ অনুপস্থিত। এর সঙ্গে আছে ব্যাংকের চরম অসহযোগিতা। ১৫ শতাংশ সুদ দিয়ে বিনিয়োগে যাওয়া মানে আত্মহত্যার প্রস্তুতি নিয়ে অগ্রসর হওয়া।’

ওভেন পোশাক রফতানিকারকরা বলছেন সাধারণত রফতানিতে নিটওয়্যার পণ্যই এগিয়ে থাকে। দুই ধরনের পণ্যের প্রবৃদ্ধির পার্থক্য খুবই সামান্য, অর্থাৎ উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। যদিও নিটওয়্যার রফতানিকারকদের আশঙ্কা যথাযথভাবে বিনিয়োগ করতে না পারলে পরিস্থিতি দিনে দিনে আরো নেতিবাচক হতে পারে।

বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রফতানিতে বেশির ভাগ সময় নিটওয়্যারই ভালো অবস্থানে থাকে। বর্তমানে নিটওয়্যার সামান্য একটু পিছিয়ে আছে। এ বছর দেখা যাচ্ছে ওভেন কিছুটা শক্তিশালী আছে। নিটওয়্যারের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে অবশ্যই অনেক ভালো। ওভেনের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশের মতো কাপড় দেশে তৈরি হলেও এখনো অনেক কাপড় আমদানি করতে হচ্ছে। তারপরও নিটওয়্যারের তুলনায় ওভেনের অবস্থা কিছুটা ভালো।’

তিনি আরো বলেন, ‘ভারত নিটওয়্যারে বেশ শক্তিশালী। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভালো করছে। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের ওপর ট্যারিফ ৫০ শতাংশ, ফলে দেশটির রফতানিকারকদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ইউরোপ ও অপ্রচলিত বাজারমুখী। এ দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো লড়াই করে যাচ্ছে ভারত, যা বাংলাদেশের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জের। আবার যুক্তরাষ্ট্রে কনজাম্পশন কমে গেছে, মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।’

নিটওয়্যার রফতানিতে কিছুটা পিছিয়ে যাওয়ায় উদ্বেগের কিছু নেই জানিয়ে ইনামুল হক বলেন, ‘নিটওয়্যার এবং ওভেন সব ধরনের পোশাকের জন্য বর্তমানে ম্যান মেড ফাইবার বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে এখানে বাংলাদেশের অনেক সুযোগ রয়েছে, যা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের বাজার আরো শক্তিশালী হবে।’

আরও